রবিবার, ১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জামায়াত পেশ করলো জনমুখী ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটির ছায়া বাজেট

জামায়েতে ইসলামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জনকল্যাণভিত্তিক বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ পেশ করেছে। বুধবার নয়, মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ অনুষ্ঠানে ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এই বাজেট উপস্থাপন করেন।

প্রস্তাবিত বাজেটের মোট পরিমাণ ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয় হিসেবে লক্ষ্য রাখা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। ফলস্বরূপ সামগ্রিক ঘাটতি আঙ্কিত হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ বলে জানানো হয়েছে।

জামায়াত জানায়, তাদের বিকল্প বাজেটের মূল দর্শন হবে সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বাজেটে বিশেষভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক নীতিতে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ক্ষত সারানো এক প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, গত স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রায় হয়েছে ও ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এতই বড় পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে যে তা ফেরত আনা হলে বাজেট ঘাটতি মেটানো সম্ভব হতে পারে। তিনি দাবী করেন, ওই সময়ে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও মা ও শিশু সহায়তার ভাতা বর্তমান ৬৫০-৯০০ টাকার পরিবর্তে প্রথম ধাপে ১ হাজার টাকা ও পরবর্তী ধাপে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।

ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের অধিকারেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী দেশের সব মসজিদের ইমামদের জন্য মাসিক ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫ হাজার টাকা এবং খাদেমদের ৩ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা দেয়া হবে।

করনীতি ও শনাক্তকরণ সহজ করার উদ্যোগ হিসেবে এনআইডি-কে টিন নম্বর হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে—অর্থাৎ আলাদা টিআইএনের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ‘বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর চালুর কথাও প্রস্তাবনায় রয়েছে।

করছাড় ও করমুক্ত আয়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়েছে: ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানে সাড়ে ৪ লাখ টাকার বদলে বাড়িয়ে ৫ লাখ করা হবে। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার খরচ হিসেবে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত করছাড় এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য মাথাপিছু অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা কর রেয়াত প্রদানের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে। প্রস্তাবনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডেরদের জন্য ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

মাতৃত্বকালীন সেবায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, গর্ভধারণ থেকে শুরু করে দুই বছর পর্যন্ত সকল মায়ের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষা খাতে বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রাসা সরকারিকরণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সাইফুল আলম মিলন পুরনো শাসনকালের উন্নয়নকথনের সমালোচনা করে বলেন, শুধু জিডিপির সংখ্যাগত বৃদ্ধি দেখানো হয়েছিল কিন্তু জনগণের বাস্তব জীবনমানের উন্নয়ন হয়নি। তিনি জানান, তাদের প্রস্তাবিত বাজেট প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয়; বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা নির্ভর নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অদক্ষতা দূর করে স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদবণ্টন করে একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির ভিত্তি গঠন করতে চান তারা।

অনুষ্ঠানে জামায়াত নেতৃত্ব জানান, জাতীয় সংসদে সরকারি বাজেট পাসের আগে জনগণের কাছে তাদের কল্যাণমুখী আর্থিক ভাবনা তুলে ধরতেই এই বিকল্প বাজেট দেওয়া হয়েছে।