মঙ্গলবার, ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জামায়াত পেশ করলো ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটির ‘জনমুখী ছায়া বাজেট’

বিগত দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ক্ষত সারিয়ে জনকল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনকে লক্ষ্য করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি।

মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন এ বাজেট উপস্থাপন করেন।

জামায়াতের প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী মোট রাজস্ব আয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। ফলে বাজেটের সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ।

বিকল্প বাজেটের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে মিলন সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়ার কথা বলেন। তিনি বর্ণনা করেন, অভিশপ্ত অতীতের স্বৈরচক্র ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে এবং সেই অর্থ ফিরিয়ে আনাটাই বাজেট ঘাটতি কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। মাতৃত্বকালীন সেবায় পরিবর্তন আনতে বলা হয়েছে— শিশু সম্ভাবনার শুরু থেকেই প্রতিটি মায়ের জন্য দু’বছর পর্যন্ত বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি বিনামূল্যে মাতৃত্বকালীন চিকিৎসাসেবা প্রসারের সুপারিশ করা হয়েছে।

সমাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও মা-শিশু সহায়তা কার্যক্রমের ভাতা বর্তমানে ৬৫০–৯০০ টাকা থেকে প্রথম ধাপে ১ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খাদেমদেরও সম্মানী বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে—ইমামদের মাসিক ৭,৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫,০০০ টাকা ও খাদেমদের ৩,০০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কর ও রাজস্ব ব্যবস্থায় পাঠানো পরিবর্তনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)কে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব। করজাল প্রসারে আলাদা টিন নম্বরের পরিবর্তে এনআইডি ব্যবহার করা হলে সহজ ও স্বচ্ছ হবে—এছাড়াও ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর’ চালু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; একই সঙ্গে করদাতাদের সন্তানদের শিক্ষাখরচ হিসেবে বছরে ৫০,০০০ টাকা এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য মাথাপিছু অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত কররেয়াতের প্রস্তাব রেখেছে জামায়াত।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছে—এতে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ বাস্তবায়ন এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন করার সুপারিশ রয়েছে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রাসা সরকারিকরণের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। জামায়াত নেতা বলেন, গত শাসনকালে কেবলমাত্র জিডিপির সংখ্যাগত বৃদ্ধির দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছিল, কিন্তু জনগণের বাস্তব জীবনমান উন্নয়ন হয়নি; ২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন থেকে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তাদের এই প্রস্তাবিত বাজেট প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয়, বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা নির্ভর নীতি অনুসরণ করে স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে রচিত। মিলন বলেন, জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হওয়ার আগে জনগণের কাছে নিজেদের কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ভাবনা পাঠানোর উদ্দেশ্যেই এই বিকল্প বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে।