বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য একটি জনকল্যাণমুখী বিকল্প বাজেট বা ‘ছায়া বাজেট’ পেশ করেছে। তারা এই বাজেটকে একটি ইনসাফভিত্তিক ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই বাজেট পেশ করেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের নেতা সাইফুল আলম খান মিলন। অনুষ্ঠানে তিনি বাজেটের মূল ভিশন ও প্রস্তাবিত প্রধান ধারা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন।
জামায়াতের প্রস্তাব অনুযায়ী ছায়া বাজেটের মোট আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত খরচ এবং রাজস্ব হিসাব মিলিয়ে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিকল্প এই বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে দলটি ‘সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় অভিসিক্ত আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। দেশের অতীত শাসনামলের সময়কার দম্ভ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা করে সাইফুল আলম বলেন, লুটপাট ও অর্থপাচার বন্ধ করে বাজেট ঘাটতি কমানো সম্ভব। তার ভাষ্যে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত দেশ থেকে অর্থপাচারের পরিমাণ হিসেবে তারা ২৮ লাখ কোটি টাকার উল্লেখ করেছেন এবং তা ফিরে আনা এক মূল পথ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এই প্রতিশ্রুতি বাজেটের কেন্দ্রে রয়েছে। বিশেষত মাতৃত্বকালীন সেবা বিনামূল্যে প্রদানের প্রস্তাব রেখেছেন তারা: সন্তান সম্ভাবনার শুরু থেকে প্রথম দুই বছরের জন্য সকল মায়ের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব আনা হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা বর্তমানে ৬৫০–৯০০ টাকার মধ্যে থাকলে তা পর্যায়ক্রমে প্রথমে ১ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ধর্মীয় কার্যক্রমের সহায়তায় ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্যও ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে—সকল মসজিদের ইমামদের মাসিক ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫ হাজার টাকা এবং খাদেমদের ৩ হাজার টাকা করে সম্মানী দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আর্থিক ও করনীতিতে পরিবর্তনের অংশ হিসেবে জামায়াত এনআইডি-কে টিন হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে ব্যবসায়িক পরিচয়পত্র ও করজাল সন্নিবেশিত করা যায়। পাশাপাশি স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর চালু করার ভাবনা জানিয়েছে দলটি। ব্যক্তিগত আয়ে করমুক্ত সীমা বর্তমান সাড়ে ৪ লাখ টাকাকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষাবায়র হিসেবে একজন করদাতার সন্তানের পড়াশোনার খরচ বাবদ বছরে ৫০ হাজার টাকার কররেহাৎ এবং পরিবারের প্রতিজন সদস্যের জন্য মাথাপিছু অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকার করছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ ও ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ও মাদ্রাসার সরকারিকরণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজেটে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রাসা সরকারিকরণ করার প্রস্তাব বলা হয়েছে।
সাইফুল আলম খান মিলন অনুষ্ঠানে বলেন, তাদের বিকল্প বাজেটের লক্ষ্য কেবল পরিসংখ্যানভিত্তিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়; বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা নির্ভর অর্থনীতি গঠন করা। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অদক্ষতা হটিয়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির ভিত্তি গড়া সম্ভব।
জামায়াত নেতা আরও বলেন, জাতীয় সংসদে সরকারি বাজেট পাস হওয়ার আগে জনগণের কাছে নিজেদের কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ভাবনা তুলে ধরা তাদের ঐচ্ছিক উদ্যোগ; তাই এই বিকল্প বাজেট জনগণের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানটি দলের পক্ষ থেকে তাদের নীতি ও প্রস্তাবনা তুলে ধরার একটি মঞ্চ ছিল।





