বুধবার, ১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রতিশোধের মানসিকতা ত্যাগ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রতিশোধের বাইরেও চলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ব্যক্তিগত ক্ষতি বা অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়া কোনো সমস্যার সমাধান নয়; বরং দেশের ভবিষ্যত গঠনে মনোযোগ দিন—এটিই এখন জরুরি।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপি বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা জানান। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের চিন্তা-ধারা বদলাতে হবে। ‘‘হ্যাঁ, আমার সঙ্গেও যা হয়েছে, তা প্রতিশোধ করে ফিরবে না। তাই প্রতিশোধের মানসিকতা ত্যাগ করে দেশের জন্য কী করা যায় সেই দিকে মনযোগ দিতে হবে। সাফল্য আসবে পরে—অন্তত দেশের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা নিয়ে এগোলে অনেক কিছু বদলে যায়।’’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপি সরকার বারবার প্রমাণ করেছে যে গণমাধ্যমের সঙ্গে তাদের কোনো শত্রুতা নেই এবং বর্তমান সরকারও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আগ্রহী। তিনি ক্ষমতাসীনদের ভুল নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করার আহ্বান জানান।

এই দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘আজকের দিনটি বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একসময় সবত্রিখানে পত্রিকাগুলো বন্ধ ছিল; তখন হাতে গোনা মাত্র চারটি পত্রিকা ছিল। সেই তীব্র গলায় now—এ অবস্থান থেকে আমরা আজ এতজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছি।’’ তিনি অতীতের যুগে সংবাদপত্রের ওপর আরোপিত তালাবদ্ধতার ইতিহাসও স্মরণ করিয়েছেন এবং স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করে সংবাদপত্রের ওপর থেকে রেস্ট্রিকশন তুলে নেন। এরপর কীভাবে গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিকশিত হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হয়েছে—এই আক্ষেপও করেন তিনি।

প্রতি বছর ১৬ জুনকে দেশভরে সংবাদপত্রের কালো দিবস হিসেবে স্মরণ করা হয়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে তখনকার বাকশাল সরকার শীর্ষক নির্দেশে চারটি সরকারি প্রচারপত্র ছাড়া সব পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ ও ডিক্লারেশন বাতিল করেছিল। পরের বছর থেকেই সাংবাদিক সমাজ দিনটি কালো দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।

সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘সরকার একা কিছু করতে পারবে না—আপনাদের সহযোগিতার দরকার। আপনারা সহযোগিতা করবেন, তবেই আমি বুঝতে পারব কাজটা ঠিকঠাক হচ্ছে কি না।’’ তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকতা যদি দেশভক্তিমূলক ও গঠনমূলক হয়, তাহলে দেশের কাজে বাস্তব পরিবর্তন ঘটবে।

তরুণ প্রজন্মের সমস্যা হিসেবে মাদকপ্রকোপের ওপর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যদিও বিশ্বজুড়ে মাদক আছে, আমাদের দেশে এর বিস্তার আশঙ্কাজনক মাত্রায়। আইনশাসন ও চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা বুঝেই সমাধানের বিকল্প পথ খুঁজে নিতে হবে। তরুণদের শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে ইতিবাচক কাজে লাগানোর জন্য খেলাধুলা ও সংস্কৃতি অপরিহার্য; কিন্তু দেশের বেশিরভাগ এলাকায় খেলাধুলার মাঠের স্বল্পতা আছে।

সরকারের উদ্যোগ হিসেবে তিনি কুঁড়ি স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং সম্প্রতি একটি শিক্ষা বিভাগের ইভেন্টে প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেন। এতে দল-মত নির্বিশেষে ছেলেমেয়ে মিলেছিল, তবু তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন যে এই বড় আয়োজন সংবাদমাধ্যমে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।

শুধু খেলাধুলা নয়, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী মেলাকে জেলায়-জেলায় সম্প্রসারিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বছরজুড়ে সাংস্কৃতিক ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা চালু রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুবসমাজকে সঠিক পথে ফেরাতে এসব চর্চা অপরিহার্য।

নাগরিক মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নিরীহ প্রাণীর ওপর অত্যাচারের ভিডিও তোলা হচ্ছে—এগুলো অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক। তিনি বলেছিলেন, স্কুল স্তর থেকেই সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে এবং তথ্য মন্ত্রণালয়কে সচেতনতা কর্মসূচি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে থাকা ‘অসম্ভব চাপ’ অনুভব করছেন জানিয়ে বলেন, মানুষের প্রত্যাশার তীব্রতা ও অনিবার্য সীমাবদ্ধতার কারণে দায়িত্বব্যাপী চাপ বেড়ে যায়। পিতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘‘কেউ বলেছিল যদি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা না থেকে ৪৮ ঘন্টা হত, আরও ভাল কাজ করা যেত।’’ তিনি যোগ করেন, নিজের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধের চেয়ে দেশের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে চান।

তারেক রহমান বলেন, নিজে জেলের অভিজ্ঞতায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করেছেন; পিঠের আঘাতের ফলে আজও ব্যথা আছে। কিন্তু এই ক্ষতি নিয়ে প্রতিশোধের সঙ্গে সময় নষ্ট না করে দেশের মঙ্গলকে কেন্দ্র করে কাজ করা বেশি বোধগম্য। তিনি সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন, তার এই বার্তা দলের নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবেন।

মতবিনিময় সভার শুরুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দুপুরের খাবার গ্রহণ করেন। সভার সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি। সভায় উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, স্পিচ রাইটার এসএএম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন, শাহাদাত হোসেন স্বাধীনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।