মঙ্গলবার, ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

লালমনিরহাটে নিখোঁজ শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার: জনতা–পুলিশ সংঘর্ষে এসপি-সহ ২০ আহত

লালমনিরহাটের আদিতমারীতে নিখোঁজ এক শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতার সঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যাপক সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন লালমনিরহাটের পুলিশ সুপারসহ উপজেলা থানা কর্মকর্তারা। সংঘর্ষের সময় জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ সাতটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

ঘটনাটি মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে আদিতমারীর ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে ঘটে। নিহত নন্দিনী কান্ত রায় (৭) ওই গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে। এলাকাবাসী ও পরিবারের অভিযোগ, গ্রামটির এক মাদকসেবী বিধান চন্দ্র রায় (২২) শিশুটিকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে গিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণ ও হত্যা করে, পরে লাশ মাটিতে পুঁতে লুকিয়ে রেখেছিল।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, নন্দিনী সোমবার বিকালে হঠাৎ নিখোঁজ হয়। পরিবারের অনুসন্ধান থেকে কোনো ফল না পেয়ে মঙ্গলবার সকালে পরের দিন আবার খোঁজখবর নেয়া হয়। বাড়ির পাশের ভুট্টাক্ষেতে নতুন খোঁড়া নরম মাটি দেখে সন্দেহ হলে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি লাশ বের হয়ে আসে।

স্থানীয়দের দাবি, সোমবার সন্ধ্যায় এক প্রতিবেশী বিধানকে ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল হাতে ফিরতে দেখেন। সেই তথ্য নিয়ে ক্ষুব্ধ জনতা বিধানের বাড়িতে হামলা করে। পালাতে কৌশল হিসেবে বিধান ঘরে তালা দিয়ে আত্মগোপন করলে জনতা তালা ভেঙে ঘরে ঢুকতে চেষ্টা করে; পরে তাকে ধরতেও পায়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিধানকে হেফাজতে নিলে জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং মামলা-শাস্তি দাবি করে পুলিশের ওপর হামলা করে। লালমনিরহাট পুলিশের এসপি আসাদুজ্জামান ও ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থলে গেলে তারা ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তারা—জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান সহ—অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি তীব্র হয় এবং জনতা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের লোকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখে।

ঘটনাস্থলে সদর, কালীগঞ্জ থানা, ডিবি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট এবং বিজিবি উপস্থিত হলেও উত্তেজিত জনতা তাদের উপেক্ষা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ ও বিজিবি তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জনতা ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। পুলিশের বহর বের হওয়ার সময় জনতা চারপাশ থেকে ইটপাতকেল নিক্ষেপ করে; এতে এসপি আসাদুজ্জামান, ওসি নাজমুল হকসহ প্রায় ২০ জন আহত হন। এই সংঘর্ষে জেলা প্রশাসকের গাড়ি ও পুলিশের প্রিজন ভ্যানসহ মোট সাতটি গাড়ি ভাঙচুরের শিকার হয়।

লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘উত্তেজিত জনতার ইটের আঘাতে আমি নিজেও আহত হয়েছি। পরিস্থিতি সামলাতে তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। কয়েকজন পুলিশ আহত এবং আমাদের বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার কারণে আদিতমারী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।’’

পুলিশের বরাতে জানানো হয়েছে, শিশুর হত্যার মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র ও তার পিতা রণজিৎ কুমারকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি কাজ বাধাসহ অন্যান্য ঘটনায় আরও মামলা দায়ের করা হবে বলে পুলিশ জানান।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘‘নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্ত করা হবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। বিরতিতে ওসিকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।’’