সোমবার, ২২শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জিয়াউল আহসানের দেহরক্ষী ইমরুল কায়েসের দাবি: ১৫০–২০০ জনকে হত্যা করতে দেখা

জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের দেহরক্ষী ছিলেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দিয়ে বলেছেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে থাকা অবস্থায় তিনি প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে হত্যা হতে দেখেছেন।

ইমরুল রোববার ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের আশায় তিনি এসব তথ্য প্রকাশ করছেন যাতে ভবিষ্যতে কোনো সৈনিককে তার মতো অবস্থার মুখোমুখি না হতে হয়। তিনি ওই সময়ে জিয়াউল আহসানের রানার (দেহরক্ষী) ছিলেন এবং ২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত র‍্যাব সদর দফতরে কর্মরত ছিলেন।

জবানবন্দিতে ইমরুল জানান, তিনি ২০০১ সালের ৫ এপ্রিল সৈনিক হিসেবে সেনায় যোগ দেন এবং ২০১০ সালের ১০ আগস্ট র‍্যাবে পোস্টিং পান। রানার হিসেবে তার কাজ ছিল সব সময় জিয়াউলের সঙ্গে থাকা। এর ফলে তিনি জিয়াউলকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতে দেখেছেন—জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই অফিস, আর্মি সদর দপ্তর, ডিবিপ্রধানের কার্যালয়, সচিবালয়সহ মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের বাড়িতেও যেতেন।

ইমরুল বলেন, জিয়াউলের রাজনৈতিক ও ক্ষমতাশীল অনেক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়ার সময় জিয়াউলের গাড়িতে অস্ত্র থাকতে দেখলেও তা তল্লাশি করা হতো না।

অনেক পরিচিত ঘটনাই তিনি বর্ণনা করেন। যোগদানের আড়াই সপ্তাহ পর গভীর রাতে র‍্যাব-১-এর সামনের রাস্তায় গিয়ে এক বস্তা ফেলে দেওয়ার নির্দেশ পান—বস্তার মধ্যে ছিল গলত Bodies। পরে সেটি রেললাইনের ওপরে রেখে একটি ট্রেন চলে গেলে তারা সেখান থেকে চলে যান।

একাধিক ‘সাজানো’ অভিযানের কথা জানিয়েছেন ইমরুল। সুন্দরবন অভিযানে র‍্যাব সদস্যদের নিয়ে গিয়ে জঙ্গলের ভেতর থেকে গুলির শব্দ করিয়ে পরে সেখানে আহত অবস্থায় পড়ে থাকা মৃতদেহ দেখতেন; এটিকে তিনি কৌশলে সাজানো অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন। উত্তরা নর্থ টাওয়ারে এক ইফতারের আগে তিনি ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে দেখেন চারজনকে ক্রসফায়ারে ছাড়া হয়েছে — ওই ঘটনাটিও সাজানো বলছেন।

২০১২ সালের এক ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, তিনটি মাইক্রোবাসে করে তারা ১১ জন আসামিকে নিয়ে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্পের কাছে গিয়ে নৌকায় তুলে নিয়ে নদীর মাঝখানে গিয়ে তাদের হত্যা করে পানিতে ফেলে দেয়। ওই অভিযানে জিয়াউল, মেজর নওশাদ, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ, কমান্ডার সোহায়েল ও এডিজি (অপস) মুজিবও উপস্থিত ছিলেন।

আর একটি ঘটনায় র‍্যাব-৪-এর সেফ হাউস থেকে দুই আসামিকে মাইক্রোবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। এক জনকে নামিয়ে জিয়াউল মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন; গুলিতে মাথায় লাগার ফলে আগুন ধরে যাওয়ার কথাও তিনি জানান। একইভাবে কিছু ক্ষেত্রে হত্যার পর লুঙ্গি খুলে নির্যাতিতদের ব্রিজ বা পানিতে ফেলে দেওয়ার বর্ণনাও দিয়েছেন।

বরিশালের ঘটনায় তিনি বলেছে, পাথরঘাটায় চরদুয়ানি বাজার থেকে নিয়ে গিয়ে বলেশ্বর নদে কয়েকজনকে হত্যা করে সিমেন্ট ভর্তি বস্তার সঙ্গে বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া হতো; কেউ কেউ বলছেন পেট কেটে ফেলা হতো।

টিএফআই সেল থেকে নেওয়া দুইজন আসামিকে জাফলং সীমান্তে নিয়ে গিয়ে ভারতীয়দের কাছে হস্তান্তরের কথাও জবানবন্দিতে জানিয়েছে ইমরুল। তিনি জানান, রাতে সেখানে ভারতীয়দের হাতে আটককৃত আসামিদের হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং পরে রাস্তায় নেমে একের পর এক হন্তারকৃত করা হয়।

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর অনুষ্ঠিত ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’-এ পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার সময় জিয়াউল ৮–১০ জন বিডিআর সদস্যকে ইনজেকশন ও গুলি করে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়ার কথাও ইমরুল বলেছেন।

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহরণের ঘটনাও ইমরুলের জবানবন্দিতে এসেছে। তিনি বলেন, মহাখালী ওভারব্রিজ এলাকায় ইলিয়াস আলী অপহরণ করা হয়; পরে কনসিলিডেটেড রেকর্ড ও সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট করার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া জিয়াউলের ফোনে তারেক আহমেদ সিদ্দিককে বলা হয়েছে—’ইলিয়াসকে গলফ করেছি’—এরকম কথাও তিনি শুনেছেন বলে দাবি করেছেন।

ইমরুল বলেছেন, দেহরক্ষীর অবস্থায় তিনি বিভিন্নভাবে আসামিদের গুম এবং হত্যা দেখতে পেয়েছেন—গোলাগুলি এবং ইনজেকশন ব্যবহার করে। এই ইনজেকশন করা হতো কখনো টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনো গাড়ির মধ্যে। র‍্যাব থেকে প্রস্থান করার পর তিনি আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেননি।

জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে ইমরুল কাঁদতে কাঁদতেই বলেছেন, ‘আমি দেশের জন্য শপথ নিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছি, কিন্তু কখনওই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসেবে দেখেছি, তিনি ওই সময়কালে ১৫০–২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি দিচ্ছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি এবং চাই কোনো সৈনিক যেন আমার মতো অবস্থার সম্মুখীন না হয়।’

ইমরুল কায়েস এই জবানবন্দি দিয়েছেন জিয়াউলের বিরুদ্ধে সরকারের শাসনকালে গুম ও হত্যার অভিযোগের মামলার পঞ্চম সাক্ষীরূপে; ওই মামলায় গত ১৪ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে তার বিস্তৃত বয়ান তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।