মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গুম ও হেফাজতে হত্যার গল্প ‘সতলুজ’ ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে সরানো হল, তীব্র বিতর্ক

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভের ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে পাঞ্জাবের বিতর্কিত ছবি ‘সতলুজ’ সরিয়ে নেওয়ার খবর জানার পরে দর্শক ও রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। মুক্তি পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের দর্শকদের জন্য ছবিটির স্ট্রিমিং বন্ধ করা হয়।

সেন্সিটিভ মানবাধিকার বিষয়ভিত্তিক এই চলচ্চিত্রটি শিখ অধিকারকর্মী জশবন্ত সিং খালরার জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত; প্রধান ভূমিকায় আছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক দিলজিৎ দোসাঞ্জ। ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার মুহূর্তেই দিলজিৎ তার ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন এবং ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না।”

দিলজিৎ ভক্তদের উদ্দেশ্যে আগেভাগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ছবিটি নেমে যেতে পারে। গত শনিবার এক ইনস্টাগ্রাম লাইভে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, সোমবারের মধ্যে ছবিটি নামিয়ে নেওয়া হতে পারে। তবে কোনো চিন্তা নেই, আপনারা এটি ডাউনলোড করে রাখুন।’ পরে রাজস্থানে খোলা আকাশের নিচে একটি গণপ্রদর্শনীর ভিডিও শেয়ার করে তিনি পাঞ্জাবিতে লিখেছেন, ‘এই ফিল্ম আর থামানো যাবে না; খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বরকে কেউ দমাতে পারবে না।’

জি-ফাইভ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্ল্যাটফর্মের গ্লোবাল ভার্সনে ছবিটি এখনও উপলব্ধ থাকলেও ভারতে তা সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তারা জানায় যে মুক্তির পর দর্শক প্রতিক্রিয়া বেশ উৎসাহব্যাঞ্জক; প্ল্যাটফর্মটি ছবির সৃজনশীলতা সমর্থন করে, তবে চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ভারতে স্ট্রিমিং বন্ধ রাখা হয়েছে। জি-ফাইভ জানান, তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছবিটি যত দ্রুত সম্ভব ভারতীয় দর্শকদের কাছে ফিরিয়ে আনতে কাজ করবেন।

ছবিটির বিষয়বস্তু মূলত ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে পাঞ্জাবে ঘটানো নিখোঁজ হওয়া ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের রেকর্ড ও সৎকারের লড়াইকে তুলে ধরে। পরিচালক হানি ত্রেহান জানিয়েছেন যে থিয়েটার মুক্তি না পাওয়ায় গোপনে ওটিটি মুক্তির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, সেন্সর বোর্ড থেকে দীর্ঘ বিলম্ব ও কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই প্রমাণ মিলায়নি, ফলে প্রযোজকরা সেন্সর সার্টিফিকেট ছাড়া ওটিটি রুট বেছে নেন। দিলজিৎও বলেছে যে প্ল্যাটফর্মে ছবিটি কোনো কাটছাঁট ছাড়াই স্ট্রিম করা হয়েছিল।

রাজনৈতিক মহলে ছবিটি সরিয়ে নেওয়া নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। শিরোমনি আকালি দলের (এসএডি) সভাপতি সুখবীর সিং বাদল এক পোস্টে এটিকে ‘অ joint স্মৃতি, সত্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে পাঞ্জাবকে তার অতীতের ইতিহাস জানতে বাধা দেওয়া উচিত নয়। কংগ্রেস নেতা সুখপাল সিং খাইরা অবিলম্বে ছবিটি প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনার দাবি করেছেন এবং বলেছেন যে ছবিতে দেখানো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আদালতের রায়ের সঙ্গতিপূর্ণ। আম আদমি পার্টির সাংসদ মালবিন্দর সিং কাং কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, ছবিটি ব্লক করে তারা পাঞ্জাবের সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। শিরোমনি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটির (এসজিপিসি) প্রধান সচিব কুলবন্ত সিং মানান বলেছেন, জনগণের আছে এই ছবি দেখতে ও নিজস্ব মতামত গঠন করার অধিকার।

এই ছবির সেন্সরসংক্রান্ত জটিল ইতিহাস রয়েছে। প্রথমে ২০২২ সালে ‘ঘাল্লুঘারা’ শিরোনামে সিবিএফসি-র কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে বোর্ড ১২৭টি দৃশ্য কেটে নাম বদলে ‘পাঞ্জাব ৯৫’ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। প্রযোজকরা বম্বে হাইকোর্টে আপিল করেছিলেন, পরে আপিল প্রত্যাহার করেন। দীর্ঘ তিন বছরের জটিলতার পর এবং ২০২৩ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রিমিয়ার থেকেও ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার পর অবশেষে গত ৩ জুলাই ‘সতলুজ’ নামে জি-ফাইভে মুক্তি পায়।

ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র জশবন্ত সিং খালরার ভূমিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাতে হয়। ১৯৯০-এর দশকে খালরার তদন্তে প্রায় ২৫ হাজার অজ্ঞাতনামা বা পোড়ানো মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়; এই অনুসন্ধানে শত শত পুলিশ কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে। ১৯৯৫ সালে তাকে অপহরণ করা হয় এবং পরে পুলিশের হেফাজতে হত্যা করা হয়—এর পর কোর্টে বিচার চলে এবং ২০০৭ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট কয়েকজন পুলিশের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়।

ছবিটি ভারতীয় ওটিটি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র অঙ্গনে ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও পক্ষপাতমূলক সেন্সরশিপ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। সমালোচকরা জিজ্ঞেস করছেন, সেখানে যেখানে বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয়ক কিছু সিনেমা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তি পায়, সেখানে কেন পাঞ্জাবের বাস্তব মানবাধিকার ইস্যু ভিত্তিক চলচ্চিত্রটিকে ভারতীয় দর্শকদের থেকে দূরে রাখা হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনি লড়াই, রাজনৈতিক চাপ এবং জনমত—সব মিলিয়ে ‘সতলুজ’ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। দর্শক, সমালোচক ও রাজনীতি—তিন দিক থেকেই এই গল্পে সামনে যা প্রশ্ন উঠে তা ভারতের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি ও মুক্ত মতপ্রকাশের débats-কে নতুন করে উজ্জ্বল করেছে।