শনিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে পাকিস্তানও জড়াতে পারে

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরবে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকিস্তানের মধ্যে শঙ্কা তীব্র হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান অস্থিরতা পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকে জটিল করে তুলতে পারে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে থাকা প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে ইসলামাবাদকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরে পাকিস্তান উদ্বিগ্ন যে ঘটনাগুলো দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে টেনে আনতে পারে। পাকিস্তান গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি উদ্যোগে মধ্যস্থতায় সহায়তা করেছিল। একই সঙ্গে গত বছর ইসলামাবাদ-রিয়াদের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় হাজারো পাকিস্তানি সেনা ও যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। এ কারণেই পাকিস্তান এখন এক নাজুক অবস্থার মুখোমুখি।

পাকিস্তানের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, জাতীয় স্তরের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্টভাবে জানান দিয়েছে, ‘সৌদি আরবের ওপর হামলা মানে পাকিস্তানের ওপর হামলা — এটি আমাদের রেড লাইন।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা একই উদ্বেগ তুলে ধরেছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলে দিয়েছেন যে উত্তেজনা এত দ্রুত বাড়বে, তা পাকিস্তান আগে অনুমান করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা পূর্বের তুলনায় গভীর প্রভাব ফেলতে পারে কারণ পাকিস্তানি সেনারা সৌদি সীমান্তের কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছেন; ফলে সংঘাত যদি বাড়ে, পাকিস্তান সরাসরি ঝুঁকিতে পড়বে। এছাড়া ইসলামাবাদ আশঙ্কা করছে যে হুথি-সৌদি সংঘাত লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, যা পাকিস্তানসহ বহু দেশের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

পাঞ্জাবের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গুলাম মোস্তফা বলেছেন, আপাতত দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সব পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু ‘হুথিরা যদি সৌদি আরবে হামলার পরিধি বাড়ায়, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।’ অন্যদিকে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানে সামরিক বাহিনীর প্রভাব বাড়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক গতিশীলতা বদলে যাচ্ছে এবং ইসলামাবাদ সেটি খুব কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করছে।

উত্তেজনার দিনে— সপ্তাহের শুরুতে—ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর পিছিয়ে যায়; পরে এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল দুই দিন বিলম্বে পৌঁছায়। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা ইস্যুও ছিল এক আলোচ্যসূচি। সরকারিভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী তখন কোনো মন্তব্য করেনি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি ব্রিফিংয়ে সমস্ত পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান এবং যোগাযোগ, সংলাপ ও কূটনীতির গুরুত্ব আরোপ করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি পাকিস্তান আঞ্চলিকভাবে বেশি কার্যকর ভূমিকা নিতে চায়, তাহলে এটিই জটিলতার অংশ—সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর জ্বালানি নির্ভরতা এবং মধ্যস্থতার কারণে গৃহীত বিনিয়োগ সবই বিবেচনায় রাখতে হবে। ইসলামাবাদ জানিয়েছে যে তারা মধ্যস্থতা থেকে সরে যাবে না, কিন্তু একই সঙ্গে রিয়াদের অনুরোধ এলে তারা তাদের পক্ষে দাঁড়াবে বলেও এক সূত্র মন্তব্য করেছে।

সংক্ষিপ্ত করে বললে, পাকিস্তান এখন কূটনৈতিক ভারসাম্যের একটি সংকীর্ণ পথে চলছে—মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং গতিশীল অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা। বর্তমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে ইসলামাবাদের উপর পক্ষ বিপরীত চাপ আরও তীব্র হবে।