শুক্রবার, ১২ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জামায়াত পেশ করলো ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিকল্প ‘ছায়া বাজেট’

বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ক্ষত সারিয়ে একটি ইনসাফভিত্তক ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি বিকল্প বা ‘ছায়া বাজেট’ প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

জামায়াত এই প্রস্তাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যাপকভাবে প্রসারিত করা এবং ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ভাতাসহ দলিলভিত্তিক অনুকূল নীতিমালা গ্রহণের সুপারিশ করেছে।

মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন এই ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেন।

প্রস্তাবিত বাজেটটির মোট আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। এই হিসেব অনুযায়ী সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২.৪৩ শতাংশ।

জামায়াত নেতারা বলছেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে বড় অংশ হবে বিগত বছরগুলোর দুর্নীতি ও অবৈধ পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে। তাদের ভাষ্য, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে এবং তা ফিরিয়ে আনাই ঘাটতি মোকাবিলার অন্যতম উপায় হবে।

বিকল্প বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে তারা তুলে ধরেছেন সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় স্বাধীনতা ও কল্যাণমুখী আধুনিক ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্র গড়া। রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে নাগরিকদের টিন নম্বরের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্রকে ‘বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর প্রবর্তনের কথাও বলা হয়েছে।

করনীতি সংক্রান্ত প্রস্তাবে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা বর্তমান সাড়ে ৪ লাখ টাকায় পরিবর্তে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে করদাতাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ হিসেবে বছরে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য মাথাপিছু অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকার করছাড় দেয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে শিক্ষার খরচে পরিবারের বোঝা কমানো যায়।

সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানোর খাতেও বড় ঘোষণা আছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা বর্তমানে মাসে ৬৫০-৯০০ টাকা থেকে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে প্রথমত এক হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে সর্বশেষে তিন হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ধর্মীয় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের জন্যও সম্মানী প্রদানের কথা বলা হয়েছে—সকল মসজিদের ইমামদের জন্য মাসিক ৭,৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের ৫,০০০ টাকা এবং খাদেমদের ৩,০০০ টাকা ভাতা প্রদানের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের সন্তোষজনক কাজ ও খরচ মেটাতে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ১০তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

মাতৃত্বকালীন সেবায় তারা গর্ভধারণের শুরু থেকেই দুই বছর বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা শক্তিশালী হয়।

শিক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রসাকে সরকারিকরণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে মাদ্রাসা শিক্ষার মান ও সুযোগ সম্প্রসারিত করা যায়।

অনুষ্ঠানে সাইফুল আলম খান মিলন সমালোচনা করে বলেন, বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে কেবল জিডিপির পরিসংখ্যানগত উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনমান দ্রুত উন্নত হয়নি। তিনি বলেন, তাদের বিকল্প বাজেটটি প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয়; এটি সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতাভিত্তিক অর্থনীতির উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

জামায়াত নেতা আরও জানান, জাতীয় সংসদে সরকারি বাজেট পাসের আগে জনগণের সামনে নিজেদের কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ধারণা উপস্থাপন করতেই তারা এই বিকল্প বাজেট পেশ করেছে।