বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে শিল্প ও বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে মোটামুটি সন্তোষজনক জানিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদ এবং কিছু করনীতির বিষয়ে সংগঠনটির উদ্বেগও রয়েছে।
শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের দুইটি মূল প্রত্যাশা ছিল — কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমদানি সহজীকরণ। এ দুটিতেই সরকারের নেওয়া পদক্ষেপকে সন্তোষজনক বলে তারা মনে করছে।
সে অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর সুবিধা সম্প্রসারণ এবং মধ্যমেয়াদি নীতিকাঠামোর দিকে অগ্রগতি শিল্প খাতের জন্য ইতিবাচক সংকেত। সৌরপ্যানেল, মাউন্টিং স্ট্রাকচার এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর করের ছাড় বাড়ানো দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা মনে করে।
দীর্ঘদিন ধরে শিল্পখাতের দাবি ছিল উৎসে কর্তিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সমন্বয়, বহন বা ফেরতের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বাজেটে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিকেএমইএ মনে করে বাস্তবায়ন আরও সুস্পষ্ট ও দ্রুত হতে হবে। সময়মতো এআইটি সমন্বয় বা ফেরত না হলে ব্যবসার কার্যকর মূলধন আটকে যায়, তারল্য সংকট সৃষ্টি হয় এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
রপ্তানিমুখী নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি এবং দেশীয় বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহের সুযোগ দেয়ার প্রস্তাবকে রপ্তানি বাড়ানোর দিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন প্রণোদনা বাড়িয়ে তাদের মেয়াদ ৩ থেকে ৫ বছর করার সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে তারা মনে করে।
তবে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানিতে ৫ শতাংশ কর আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিকেএমইএ। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কেবল এক প্রতিষ্ঠানই এ পণ্য উৎপাদন করে এবং সেটির উৎপাদন সারা দেশের চাহিদার কাছাকাছি ১০ শতাংশেরও কম। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে চাইলে সেটি রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগী সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করবে না—এ ধরণের সূক্ষ্ম সামঞ্জস্য রাখা প্রয়োজন।
বাজেটের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে বিকেএমইএ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে পর্যাপ্ত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অভাব তুলে ধরেছে। শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগে জ্বালানি সংকট এখনও বড় বাধা হিসেবে অটকে আছে। সৌরবিদ্যুৎ আংশিকভাবে সমাধান দেবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোই উপায় হবে।
আরও একটি বড় উদ্বেগ হলো উচ্চ সুদ। ১৩–১৫ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা ভরাট করা কঠিন; ঋণের ব্যয় বাড়ায় বেসরকারি সেক্টরে ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। এ ছাড়া প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকে প্রতিবেশী দেশগুলোর বরাদ্দ সুবিধার মুখে টিকে থাকতে হবে — জমি, মূলধন সহায়তা, শ্রমিক মজুরি ও রপ্তানি প্রণোদনার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে।
বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে কিছু আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বিশেষত সংকটে থাকা বা বন্ধ কারখানাগুলোর জন্য সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন পুনরুদ্ধার ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা করে।
সামগ্রিকভাবে বাজেটের নীতিগত দিক ইতিবাচক হলেও বিকেএমইএ রাজি যে সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অনুকূল প্রভাব দেখতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকে সহজ ও কার্যকর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। সেক্ষেত্রে এই উদ্যোগগুলো বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে বলে সংগঠনটি মনে করে।





