ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভের ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে পাঞ্জাব ভিত্তিক বিতর্কিত ছবি ‘সতলুজ’ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশে তীব্র খসড়া ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় দর্শকদের জন্য ছবিটির স্ট্রিমিং বন্ধ করে দেওয়া হয়, যদিও গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে তা এখনও দেখানো যাচ্ছে।
ছবিটি শিখ মানবাধিকারকর্মী জসওয়ন্ত সিং খালরার জীবনের ওপর নির্মিত। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক দিলজিত দোসাঞ্জ; ছবির পরিচালক হানি ত্রেহান। জসওয়ন্ত খালরা ১৯৯০-এর দশকে পাঞ্জাবে গুম হওয়া এবং বিচ্ছিন্ন মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাগুলো অনুসন্ধান করে বহু অজ্ঞাত মৃতদেহের পরিচয় উদ্ঘাটন করে ছিলেন—এখনকার বিচারব্যবস্থা ও জনগণের কাছে সত্য তুলে আনার জন্য তাঁর কাজকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
ছবি ভারতের ক্যাটালগ থেকে হঠাৎ সরিয়ে নেওয়ার পর দিলজিত নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না।’ ভার্জাইটি ইন্ডিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে দিলজিত ছবিটিকে তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম অর্থবহ কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, খালরার আত্মত্যাগ ও মানবতার প্রতি তাঁর অঙ্গীকারই ছবিতে যুক্ত হওয়ার মূল কারণ ছিল।
জি-ফাইভ কর্তৃপক্ষের বিবৃতি বলছে, মুক্তির পর ছবিটির প্রতি দর্শকদের সাড়া ভালোই ছিল এবং তারা নির্মাণকর্মের পাশে রয়েছে। তবে ‘বর্তমান পরিস্থিতি’ বিবেচনায় এবং প্রয়োজনে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত বদলানো না হওয়া পর্যন্ত ভারতে ছবিটির স্ট্রিমিং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। জি-ফাইভ জানিয়েছে তারা যথাযথ পথে যত দ্রুত সম্ভব ছবিটি ভারতীয় দর্শকদের কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ঘটনাটি তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। শিরোমনি আকালি দলের সভাপতি সুখবীর সিং বাদল এ ঘটনার সমালোচনা করে বলেন, এটি আমাদের যৌথ স্মৃতি, সত্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। কংগ্রেস নেতা সুখপাল সিং খাইরা ছবিটি দ্রুত ফেরত আনার দাবি জানিয়েছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে ছবিতে যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র আছে তা আদালতের রায়ে মিল রয়েছে। আম আদমি পার্টির সংসদ সদস্য মালবিন্দর সিং কাং কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, এই ধরনের পদক্ষেপে পাঞ্জাবের ইতিহাস লুকানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। শিরোমনি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটির প্রধান সচিব কুলবন্ত সিং মানান বলেন, জনগণের কাছে ছবিটি দেখার অধিকার থাকা উচিত যাতে তারা নিজ নিজ মত গঠন করতে পারে।
এই ছবির মুক্তি সুখসাধ্যের ছিল না। ২০২২ সালে ‘ঘাল্লুঘারা’ শিরোনামে সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (সিবিএফসি)-কে জমা দেওয়া হলে বোর্ড ১২৭টি দৃশ্য কাটার নির্দেশ দেয় এবং নাম পরিবর্তনের কথা বলে। প্রযোজকরা প্রথমে বম্বে হাইকোর্টে আপিল করেন, পরে তা প্রত্যাহার করেন। তিন বছর জেঁকে থাকা সংযোজন, ২০২৩ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনী থেকে সরিয়ে নেওয়া ইত্যাদি পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৩ জুলাই ‘সতলুজ’ নামে জি-ফাইভে মুক্তি পায়। পরিচালক জানান, থিয়েটার রিলিজের সব প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ায় গোপনীয়তার সঙ্গে ওটিটি রিলিজের পথে যাওয়া হয়েছিল। দিলজিত দাবি করেছেন যে প্ল্যাটফর্মে ছবিটি কোনো কাটছাঁট ছাড়াই স্ট্রিম করা হয়েছিল।
কিন্তু কেন জসওয়ন্ত খালরার কাহিনী ও ছবিটি এতই সংবেদনশীল? খালরা ১৯৯০-এর দশকে পাঞ্জাব পুলিশের হাতে নিখোঁজ ও বিচ্ছিন্ন মরদেহ উদ্ধার এবং তাদের পরিচয় শনাক্ত করে প্রায় ২৫ হাজার মৃতদেহের রহস্য উদ্ঘাটন করেন বলে বলা হয়। তাঁর অনুসন্ধানের ফলে বহু পুলিশ কর্মকর্তার নাম জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে আসে। ১৯৯৫ সালে খালরাকে অপহরণ করে পরে পুলিশের হেফাজতেই হত্যা করা হয়—যার দায়ে পরে বিচারপ্রক্রিয়ায় কিছু পুলিশ কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন।
ছবিটির ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে চলচ্চিত্র ও সাংবাদিক মহলে ‘দ্বিমুখী নীতিস্বরূপ সেন্সরশিপ’ ও পক্ষপাতমূলক মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু হয়েছে। সমালোচকেরা বলেন, যেখানে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত বা উগ্র দাবি করা কিছু ছবিকে বাধা ছাড়াই মুক্তি মিলে—যেমন আগে দেখা বিভিন্ন বিতর্কিত শিরোনাম—সেখানে কেন পাঞ্জাবের বাস্তব মানবাধিকার বিষয়ক এই ছবিটি আটকে রাখা হচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ জন্মেছে।
এই ঘটনার ফলে ভারতীয় বিনোদন জগত ও নাগরিক স্বাধীনতা বিষয়ে পুনরায় তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। ছবিটি যখন সরে গেছে, তখনই অনেকেই চলচ্চিত্রটিকে দেখার আর মত গঠনের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলায় অধিক গুরুত্ব আরোপ করছেন—এখন সে দাবি ও প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা নজর রাখার বিষয়।





