বৃহস্পতিবার, ২৩শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আন্দোলনে কেঁপে উঠল দিল্লি, মোদির সরকারের ওপর চাপ বাড়ল

পাঠ্যপুস্তক ও ভর্তি পরীক্ষার কেলেঙ্কারি থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-তরুণদের ক্ষোভ দ্রুত বিস্তৃত হয়ে দেশের রাজনীতিতে গভীর সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা অনলাইনভিত্তিক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদ শেষ কয়েক দিনে সরাসরি নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা দিতে শুরু করেছে।

বুধবার নয়াদিল্লির জন্তর মন্ত্রে সিজেপির ডাকেই সমর্থকদের বিশাল জমায়েত হয়; সেখানে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী উপস্থিত ছিলেন। শুরুতে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ চেয়েই আন্দোলন হলেও তা এখন প্রধানমন্ত্রী মোদির পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে। বিরোধীদলীয় এমপিদের সমর্থন পেয়ে আন্দোলনটি আরও তেজ ধরেছে।

সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা উপস্থিত জনতা সমাবেশে বলেছেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা জন্তর মন্ত্র ত্যাগ করব না। তিনি যোগ করেছেন, ‘‘যে দেশে বহু বছর ধরে মানুষ প্রশ্ন করতে ভীতত, যে দেশে সরকারের সমালোচনাকে দেশদ্রোহিতার সঙ্গে তুলনা করা হতো — আমরা সেই নীরব দেশকে জাগিয়ে তুলেছি।’’

বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার পর আন্দোলনটি গত কয়েক দিনে রাজধানীর বড়তম রাস্তায় অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে পরিণত হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে সরকারকে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন; পুলিশ গত মঙ্গলবার রাহুল গান্ধীকে প্রতিবাদস্থল থেকে তুলে নিয়ে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে রাখে। বুধবার তিনি কালো পোশাক পরে পার্লামেন্টে উপস্থিত হয়ে সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন।

সমাজবাদী দলের নেতা অখিলেশ যাদবও বলেছেন, এই ইস্যুটি দেশের প্রতিটি তরুণকে প্রভাবিত করছে এবং প্রধানমন্ত্রী মোদি এখানে নীরব থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত মে মাসে দেশের প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্য থেকে। তৎকালীন নাড়া দেওয়া সেই কথায় তরুণদের ‘ককরোচ’ বা ‘পরজীবী’ বলায় সমালোচনা হলে তা সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। সেটিই অনলাইনভিত্তিক ককোরচ জনতা পার্টিকে জন্ম দিয়েছে; বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর লক্ষ লক্ষ অনুসারী রয়েছে।

পরবর্তীকালে আন্দোলনটি শুধু পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি— এটি বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, ও সরকারী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে আরো বিস্তৃত দাবিতে রূপ নিয়েছে। সোমবার পার্লামেন্ট অধিবেশনের প্রথম দিনে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা করতে গেলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। এর পরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে; কিছু বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে পাথরও ছোড়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা অপरेশনে পুলিশের কঠোরতা নিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রশ্ন তুলেছে যে দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী যেমন প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতার শর্ত পালন করেছে কি না।

আন্দোলনকারীদের পক্ষে একটি মোকদমা দায়ের করে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ আনা হলেও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদনের শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। জন্তর মন্ত্রে ইতিমধ্যে অনেকে প্রায় এক মাস ধরে অবস্থান করছেন; একটি কণ্ঠস্বর বলছে, ‘‘এটাই প্রথমবারের মতো যখন দেশের তরুণরা নিজেদের ব্যথা প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছে।’’

এএফপিকে কথা বলা কাব্য নামের এক ২০ বছরের শিক্ষার্থী বলেছেন, তিনি ভয় পাচ্ছেন—কারণ সোমবার পুলিশের বলপ্রয়োগ ও গদি আহত করা দৃশ্য দেখেছেন—তবু আন্দোলন ছাড়ার উপায় না থাকার কথাই বললেন।

এই প্রতিবাদ তরতরিয়ে জোর পেয়েছে যখন প্রকাশ্য হলো যে দেশের চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর ওপর অনলাইন মূল্যায়ন নিয়ে বিরোধও জনমানসে ক্ষোভ জাগিয়েছে। এই দুই ঘটনার ফলে শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে জনআন্দোলন তীব্র হয়েছে।

এই চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান সরকারি সংস্কার ও পার্লামেন্টে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, সরকার শিক্ষার্থীদের কাছে জবাব, সংস্কার ও জবাবদিহি প্রদানে বাধ্যবাধক। ‘‘তারা বিশৃঙ্খলার চেয়ে নিশ্চয়তা চান, স্লোগানের চাইতে সমাধান এবং বিঘ্ন ঘটানোর চাইতে দায়িত্বশীলতা চান—এই দাবিগুলো আমরা গ্রহণ করছি,’’ তিনি লিখেছেন।

আন্দোলন শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ নেই; বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের সঙ্গে বেঙ্গালুরু, গোয়া-সহ বিভিন্ন শহরেও হাজার হাজার মানুষ সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন। একটি অনলাইন আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই বিরোধ এখন সরকার ও দেশের রাজনৈতিক জীবনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে এবং তা আগামী দিনে কিভাবে পরিচালিত হবে তা নজর কাড়ছে।

সূত্র: এএফপি