ভারতীয় উপমহাদেশের সুপরিচিত সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই। সোমবার বিকেলে মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক শ্মশানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়; মুখাগ্নি দেন তাঁর ছেলে আনন্দ ভোঁসলে। এই বিদায়ের মূহুর্তে সুরের এক যুগের এক অমোঘ অধ্যায়ের পরশ তীব্র আবেগে ভরে উঠল।
গতকাল সকাল থেকেই লোয়ার পারলের আশার বাসভবন ভিড় জমে ওঠে; বাড়িটি যেন শ্রদ্ধা আর স্মৃতিচিন্তায় এক বিশাল সমাগমে পরিণত হয়েছিল। উপস্থিত ছিল কোনো উৎসবের মেজাজ নয়, বরং শোকার ছায়া। শেষকৃত্যে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর, মীমা খারিদকরসহ বলিউড ও ক্রীড়া, রাজনীতি জগতের বহু মানুষ শ্রদ্ধা জানান। উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা আমির খান, ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার, সংগীত পরিচালক এ.আর. রহমান, গায়ক জাভেদ আলি, অভিনেত্রী টাবু, আশা পারেখ, নীল নীতিন মুকেশ, জ্যাকি শ্রফ ও অনেকে। লোয়ার পারলে যারপরনাই মানুষ ভিড় করেন এবং রাস্তায় দুই পাশে দাঁড়ানো ভক্ত-অনুরাগীরা শেষ বিদায় জানাতে আসে; তাদের চোখে-মুখে ভরা ছিল অগণিত আবেগ।
শববাহী গাড়িটি সাজানো ছিল আশা ভোঁসলের প্রিয় সাদা-হলুদ রঙের ফুলে; শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন বিনোদন-রাজনীতি-খেলাধুলার বহু শীর্ষ চরিত্র। শেষকৃত্য ও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সঙ্গীত জগতে এক সময়ের অম্লান কণ্ঠকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হল।
আশা ভোঁসলে গত ১১ এপ্রিল অসুস্থ হয়ে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হন। রবিবার, ১২ এপ্রিল দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
সংগীতজীবন শুরু করেছিলেন ১৯৪৩ সালে; প্রায় আট দশক ধরে তিনি সঙ্গীতের আকাশ আলোকিত করেছেন। শুধুমাত্র হিন্দি নয়, প্রায় ২০টির বেশি ভারতীয় ভাষায় এবং কয়েকটি বিদেশি ভাষায়ও গান রেকর্ড করেছেন তিনি। অনেক হিসাবেই বলা হয়, সিনেমার জন্য ৯২৫টিরও বেশি ছবিতে গান গেয়েছেন এবং মোট গানসংখ্যা প্রায় ১২ হাজার—যা এক বিস্ময়কর রেকর্ড। ২০০৮ সালে তিনি ভারত সরকারের তরফে পদ্ম বিভূষণে সম্মানিত হন এবং ২০১১ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে তাঁকে সর্বাধিক সংখ্যক গান রেকর্ডকারীর খেতাব দেওয়া হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে আশা ভোঁসলের প্রথম বিবাহ হয় গনপাত্রাও ভোঁসলের সঙ্গে, যখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ১৬ বছর এবং গনপাত্রাও ছিলেন বেশ বড়—এর সংসার ১৯৬০ সালে ভেঙে যায়। পরে ১৯৮০ সালে প্রখ্যাত সুরকার আর.ডি. বর্মনের সঙ্গে বিয়ে করেন; ১৯৯৪ সালে আর.ডি. বর্মন মারা যান।
আশা ভোঁসলে যে কণ্ঠে আনন্দ, আবেগ, উদ্দীপনা ও বেদনাকে একসঙ্গে গেঁথে দিয়েছেন, সেই কণ্ঠ আজকের এই অমোঘ নীরবতায় ভেঙে গেলেও তাঁর গান বহু প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে জীবন ধারণ করে থাকবে। ভক্তদের চোখের জলে, স্মৃতির অজস্র নোটের মধ্য দিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন তিনি।





