মঙ্গলবার, ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ করা ১২ বিলিয়ন ডলার ফেরত দিচ্ছে

দীর্ঘ বিরোধ ও কূটনৈতিক চাপে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনায় বড় অগ্রগতি এসেছে—দুই পক্ষ একটি খসড়া চুক্তিতে পৌঁছেছে এবং আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হওয়ার মুখে।

সুইজারল্যান্ডে শুক্রবার (১৯ জুন) এই চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হওয়ার কথা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, চুক্তি স্বাক্ষর হলে হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।

খবর অনুযায়ী, কাতারের প্রতিনিধিদল তেহরানে একটি খসড়া চুক্তির নকশা ইরানি আলোচনাকারীদের হাতে তুলে দিয়েছেন। সৌজন্যপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান জানিয়েছে, খসড়ার ১৪টি শর্ত পর্যালোচনার পরে দুই পক্ষ চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত হয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে সবচেয়ে জোরদার আলোচ্য বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ হওয়া ইরানি সম্পদের মুক্তি।

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের বলেছে, আলোচনা শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে জব্দ করা ১২ বিলিয়ন ডলার হস্তান্তর করবে। খসড়া চুক্তিতে বলা আছে, আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জমে থাকা মোট ২৪ বিলিয়ন ডলার(!) ছাড়া দেওয়া হবে। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির খবরেও উল্লেখ আছে যে, আলোচনার শুরুতেই মোট অর্থের অর্ধেক অর্থাৎ ১২ বিলিয়ন ডলার ইরানকে ফেরত দেওয়া হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন এখনও এই সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত নিয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেনি। এটাই এমন একটি দিক যা বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমাবদ্ধ এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদে—যেমন ২০ বছরের জন্য—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখবে কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান এখনও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

সংক্ষেপে চুক্তির মূল ১৪ দফা:

১. লেবাননসহ সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে অবিলম্বে এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে।

২. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র কোনোরকম হস্তক্ষেপ করবে না।

৩. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা হবে।

৪. ইরানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে।

৫. ইরানের তেলখাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত থাকবে এবং ইরান তার জ্বালানি আয় ব্যবহারে পূর্ণ অধিকার পাবে।

৬. যুদ্ধাবস্থা পরবর্তী পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি আর্থিক প্রস্তাব করেছে।

৭. চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি বিশেষ আলোচনা শুরু হবে, যার মূল আলোচ্যবিষয় হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

৮. ইরান পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ সংক্রান্ত চুক্তি (NPT)–এর আওতায় পুনরায় নিশ্চিত করবে যে তারা কোনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা উন্নয়ন করবে না।

৯. এই অন্তর্বর্তীকালীন আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে নতুন কোনো সামরিক মোতায়েন করতে পারবে না।

১০. আলোচনা চলাকালীন ইরানের ওপর নতুন কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে না।

১১. আলোচনা চলাকালীন ইরানের জমে থাকা ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ ক্রমান্বয়ে অবমুক্ত করা হবে; প্রথম ধাপে ১২ বিলিয়ন ডলার হস্তান্তর করা হবে।

১২. চুক্তির শর্ত সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না তা তদারকির জন্য একটি যৌথ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হবে।

১৩. চূড়ান্ত চুক্তির বৈধতার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আনুষ্ঠানিক সমর্থন কিংবা অনুমোদন নেওয়া হবে।

১৪. ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি তেহরানের সমর্থনের বিষয়গুলো এই আলোচনা খসড়ার আওতার বাইরে রাখা হবে।

মোটকথা, এই খসড়া চুক্তি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে এবং ইলেকট্রিকভাবে জটিল আর্থিক নিষেধাজ্ঞা-সমস্যার নমনীয় সমাধান আসতে পারে। তবে চূড়ান্ত স্বাক্ষর ও কার্যকরীর আগে দু’পক্ষের মধ্যে এখনও কয়েকটি বিতর্কিত শর্ত ও সময়সীমা নিয়ে দরকষাকষি অব্যাহত রয়েছে।