বৃহস্পতিবার, ১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অভিযোগ: বাঙালি মুসলমানদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে ভারত

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কোনো মৌলিক বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলিম অধিবাসীদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে যে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী দল (বিজিবি)‑র সীমাবদ্ধ সমন্বয়ের কারণে বহু পরিবার দুই দেশের মাঝামাঝি সংক্ষিপ্ত ‘শূন্য রেখা’তে আটকে পড়েছে।

সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা জানিয়েছেন—২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত তারা বিএসএফের ২১টি ঠেলেপিঠে চেষ্টা ব্যর্থ করেছে। এসব প্রচেষ্টায় শিশুসহ ২০০-এর বেশি মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে ঠেলে দেবার চেষ্টা করা হয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেন, তাঁর ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতি অনুযায়ী শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’কে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য করা হয়েছে — এমন মন্তব্যও তিনি করেছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে তাদের মৌলিক মানবাধিকার উপেক্ষা করে নিষ্ঠুরভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রাখছে। সরকারকে অবৈধ বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে, প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নাগরিকত্ব যাচাই করতে হবে এবং মুসলিমদের প্রতি এই উদ্বেগজনক বৈরিতা বন্ধ করতে হবে।’

সংস্থাটি মোট নয়জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে। সাক্ষীরা বর্ণনা করেছেন কীভাবে রাতে বিএসএফ একদল মানুষকে সীমান্তে আনত, কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে তাদের বাংলাদেশি ভূখণ্ডে ঠেলে দেয় এবং পরে অনেকক্ষেত্রে তাদের ফিরে যেতে বাধ্য করত। কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীরা প্রবেশ অনুমতি না দেওয়ার পর বিএসএফই শেষ পর্যন্ত সেই মানুষগুলোকে আবার ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নেয়।

বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলায় স্থানীয়রা জানিয়েছে—৫ জুন বিএসএফ শিশুসহ ১০ জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে প্রায় ৭৫ ঘণ্টা ধরে টানাপোড়েন চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন (৩৫) বলেন, ‘দলটি প্রায় ৫০ ফুট বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকেছিল। স্থানীয়রা বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীদের খবর দিই। বাহিনী আসার পর তারা পিছু হটে একটি বাঁধের ওপর ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ অবস্থান নেয়।’ তিনি বলেন, প্রথম রাতে ওই দলটি ভ Severe বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টিতে ভোগে; দ্বিতীয় দিন বিএসএফ কিছু শুকনো খাবার দেয়। পরে কয়েকটি স্থানীয় বৈঠক ব্যর্থ হয়ে বিএসএফ দলটিকে ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয়।

আরও এক ঘটনায়, ৬ জুন ভোরে বিএসএফ দুইটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্য—তিন পুরুষ, দুই নারী ও এক শিশু—কে তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশি বাহিনী তাদের প্রবেশ আটক করলেও বিএসএফ তাদের বরাবরই ফেরতে দেয়নি, ফলে পরিবারগুলো সীমান্তেই আটকে পড়ে; পরে রাত কাটানোর পর ভারতীয় বাহিনী তাদের ফেরত নেয়। এরপর ৮ জুন বিএসএফ এক গর্ভবতী মা ও তাঁর শিশুসহ মোট ১১ জনকে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা শূন্য রেখায় আটকে রাখার পর আবার ভারতে ফিরিয়ে নেয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের আগে‑পরের অস্থিরতা বিষয়টি বাড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে নির্বাচন কমিশন দ্রুতভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করে, যেখানে ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের নাম বাদ পড়ায় অনেকেই আটক, বহিষ্কার ও স্থায়ী অনিশ্চয়তার শিকার হন। এর আগে ২০১৯ সালে আসামে ত্রুটিপূর্ণ নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার কারণে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন এবং হাজারো মানুষ হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়। এক ভারতীয় অধিকারকর্মী স্থানীয়ভাবে আন্দাজ করেন সীমান্ত এলাকায় এখন আনুমানিক ৪০০ জনকে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে। তার কথায়, ‘ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়াই এখন গ্রেপ্তার, আটক ও বহিষ্কারের ট্রিগার হিসেবে কাজ করছে এবং এটি ব্যাপক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।’

বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, তারা কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো মানুষকে গ্রহণ করবে না; প্রত্যাবাসন ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া মানা হবে—এমন অবস্থান তারা নিয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলেছে অনেক বাংলাদেশি অনৈধভাবে ভারতে আছে এবং তাদের স্বেচ্ছায় ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করায় যে ‘স্বেচ্ছায়’ প্রত্যাবাসন হলেও তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে হতে হবে; জোরপূর্বক বহিষ্কার ও নথি, অর্থ বা ব্যক্তিগত সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ মেনে নেওয়া যাবে না।

সংস্থাটি আরও বলেছেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন। খাবার, পানি, আবাস বা চিকিৎসা ছাড়া সীমান্তে ফেলে রাখাটা নির্মম বা অমানবিক আচরণের মধ্যে পড়ে। ভারত সরকারের উচিত প্রত্যেক ব্যক্তিকে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে মৌলিক প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা—সম্মুখীন কারণ জানানো, আইনজীবীর সহায়তা এবং আপিলের সুযোগসহ। শিশুদের সীমান্তে আটকে রাখা শিশু অধিকার সনদের লঙ্ঘন এবং দেশগুলোকে শিশুদের জাতীয়তা রক্ষার দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘জাতীয়তা যাই হোক না কেন, কাউকে দুই সারি সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। ভারতকে এই নির্মম বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে এবং দুই সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে যেন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কখনোই মৌলিক মানবিক মর্যাদার মূল্য রেখে করা না হয়।’