বৃহস্পতিবার, ৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গুম ও হেফাজতে হত্যার কাহিনি নিয়ে ‘সতলুজ’ ভারতের ক্যাটালগ থেকে সরানো—তীব্র বিতর্ক

ভারতের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভের ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে পাঞ্জাবের বিতর্কিত চলচ্চিত্র ‘সতলুজ’ আকস্মিকভাবে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশীয় দর্শকদের জন্য ছবিটির স্ট্রিমিং বন্ধ করে দেওয়া হলে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

চলচ্চিত্রটি শিখ মানবাধিকারকর্মী জশবন্ত সিং খালরার জীবন ও কাজের ওপর নির্মিত; প্রধান চরিত্রে রয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক দিলজিৎ দোসাঞ্জ। ছবিটি সরিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে দোসাঞ্জ সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “আমি এই অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। খালরা সাহেবের কণ্ঠস্বর কেউ দমাতে পারবে না,” এবং এক গণপ্রদর্শনীর ভিডিও শেয়ার করে যুক্তিও জানান যে—“এই ছবি আর থামানো যাবে না।”

জি-ফাইভ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘সতলুজ’-কে বর্তমানে ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে সরানো হয়েছে, যদিও গ্লোবাল ক্যাটালগে ছবিটি এখনও দেখা যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছে যে ছবির প্রথম সাড়া তাদেরকে প্রভাবিত করেছে এবং তারা সৃজনশীল কাজের পাশে আছে; তবে চলমান পরিস্থিতি ও উপযুক্ত নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত ভারতীয় দর্শকদের জন্য স্ট্রিমিং সাময়িক रूपে বন্ধ রাখা হয়েছে। জি-ফাইভ এ জানান যে তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছবিটি যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে।

রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে। শিরোমনি আকালি দলের সভাপতি সুখবীর সিং বাদল বলছেন, এটি আমাদের যৌথ স্মৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। কংগ্রেস নেতা সুখপাল সিং খাইরা ছবিটি দ্রুত প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনার দাবি করেন এবং উল্লেখ করেন যে ছবিতে যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো আদালতের রায়ের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ। আম আদমি পার্টির সংসদ সদস্য মালবিন্দর সিং কাং কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘ছবিটি ব্লক করে বিজেপি তাদের আসল মুখ লুকাতে চাইছে’—এমন অভিযোগও উঠেছে। শিরোমনি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক কমিটির প্রধান সচিব কুলবন্ত সিং মন্তব্য করেছেন, জনগণের কাছে দেখতে পাওয়ার এবং নিজ মত গড়ে তোলার অধিকার আছে।

এই ওটিটি মুক্তি সহজ ছিল না। ২০২২ সালে ‘ঘাল্লুঘারা’ শিরোনামে ছবিটি সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের (সিবিএফসি) কাছে পাঠানো হলে বোর্ড ১২৭টি দৃশ্য কাটার নির্দেশ দিয়েছিল এবং নাম পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিল—পরবর্তীতে প্রযোজকরা বম্বে হাইকোর্টে আপিল করেও তা প্রত্যাহার করেন। ২০২৩ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রিমিয়ার থেকেও ছবিটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ জটিলতার পর অবশেষে ছবিটি ‘সতলুজ’ নামের অধীনে ৩ জুলাই জি-ফাইভে মুক্তি পায়, কিন্তু এরপরই ভারতীয় ক্যাটালগ থেকে তা সরিয়ে নেওয়া হলো। পরিচালনায় আছেন হানি ত্রেহান; অভিনয় করেছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ ও অর্জুন রামপাল।

ছবিটির প্রেক্ষাপটটি বুঝতে হলে জশবন্ত সিং খালরার কর্মকাণ্ড জানা জরুরি। ১৯৯০-এর দশকে খালরা পাঞ্জাবে পুলিশের দ্বারা নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূতভাবে মারা যাওয়া হাজার হাজার মানুষের রহস্য উদঘাটন করেন—তার অনুসন্ধানে বহু অজ্ঞাত পরিচয়ের দেহের গোপনে দাহের বিষয় উঠে আসে। ১৯৯৫ সালে তিনি অপহরণ ও পরে পুলিশ হেফাজতে হত্যার শিকার হন। কেন্দ্রীয় তদন্তের পর ২০০৭ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে কয়েকজন পুলিশকর্মীকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়া হয়। খালরার সংগ্রাম এবং এর ফলাফল পান্ডুলিপি ও সাক্ষ্যাভিপ্রায় হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় এই চলচ্চিত্রটি অনেকের কাছে ঐতিহাসিক ও মানবাধিকারগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

চলচ্চিত্রটি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভারতের চলচ্চিত্র ও সংবাদ স্বাধীনতা নিয়ে পুরনো বিতর্কগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—কেন কিছু রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ও উগ্র রIGHT-ওরিয়েন্টেড ছবি সহজে মুক্তি পায়, কিন্তু পাঞ্জাবের বাস্তব ঘটনার ওপর নির্মিত এক মানবাধিকারভিত্তিক চলচ্চিত্রকে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে? এখন দেখার বিষয়—আইনি প্রক্রিয়া ও জনআন্দোলনের মুখে ‘সতলুজ’ কখনো ফিরে পাবে কি না, এবং এই ঘটনা ভারতের সাংস্কৃতিক মুক্তি ও সেন্সরশিপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলা বিতর্কে কি নতুন মোড় আনবে।