রবিবার, ১২ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

টানা ৭ দিনের ভারী বর্ষণে মোংলা বন্দরে খালাস বন্ধ, চিংড়ি ঘের ভেসে যাওয়ার শঙ্কা

বঙ্গোপসাগরে গড়ে ওঠা গভীর লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে মোংলা সমুদ্রবন্দর ও সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় টানা সাত দিন ধরে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ চলছে। অবিরাম বৃষ্টিতে জনজীবন স্থবির, যোগাযোগ ব্যাহত এবং মৎস্য ও চিংড়ি খামারগুলোতে গুরুতর ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

উপজেলার নিচু কয়েকশ স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে বহু মানুষ পানিবন্দি। বিশেষ করে বুড়িরডাঙ্গা, চিলা, চাঁদপাই, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা, সোনাইলতলা ও মিঠাখালি ইউনিয়নের শত শত চিংড়ি ঘের ক্ষতির মুখে পড়েছে—অনেক ঘেরের পাড় ইতোমধ্যে পানি ছুঁইছুঁই অবস্থায় পৌঁছেছে। স্থানীয় চিংড়ি চাষিরা জানাচ্ছেন, ঘেরের মাছ আটকে রাখতে তারা রাতদিন জেগে নেট, পাটা ও বাঁশের বানা দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চাষিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন—আর কয়েক ঘণ্টা এভাবে বৃষ্টি চললে ঘের ভেঙে কোটিগুণ টাকার গলদা ও বাগদা চিংড়ি ভেসে যেতে পারে। অনেক ঘেরই ব্যাংক ঋণ ও উচ্চ সুদে গড়ে উঠেছে; ঘের হারালে চাষিরা বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যে পড়বেন।

বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পড়ে মোংলা বন্দরের গুদামকরণ ও খালাস-বোঝাই কার্যক্রমেও। বন্দরের হারবার বিভাগ জানিয়েছে খাদ্যবাহী বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর খালাস-বোঝাই কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। যান্ত্রিক উপায়ে সীমিত পরিমাণে তরল ও কন্টেইনার খালাস করা হলেও চাল ও সারবাহী খোলা (বাল্ক) জাহাজের কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। বৃষ্টিতে পণ্য ভিজে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় জাহাজের হাচ (ঢাকনা) বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে; ফলে জাহাজগুলোর অবস্থানকাল বেড়ে গেছে এবং পণ্য পরিবহনে তীব্র বিলম্ব তৈরি হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জুন মোংলা বন্দরে নোঙ্গর করা ৫ হাজার ৭শ মেট্রিক টন চালকে স্বাভাবিক অবস্থায় খালাস করতে সাধারণত প্রায় চার দিনই লাগার কথা ছিল। কিন্তু অবিরাম বৃষ্টির কারণে গত ১৪ দিনে মাত্র ৯২০ মেট্রিক টনই খালাস করা সম্ভব হয়েছে। অন্যান্য জাহাজের পণ্যও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দরে আটকে আছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পানিবন্দি হয়ে পড়া মানুষের কষ্টও বাড়ছে। মোংলা পৌর এলাকার অনেক সড়ক ও নিচু এলাকার বাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় লোকেরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মোংলা নদী ও উপকূলীয় জোয়ারের উচ্চতা বাড়ায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক এবং খেয়াঘাটের মাঝিরা কাজ হারিয়ে পড়েছেন; পরিবারের রোজগার বদলে খাদ্য সংকট চলছে অনেকের।

শিক্ষাঙ্গণেও প্রভাব পড়েছে—ছাতা ও রেইনকোটে শিক্ষার্থীরা বৃষ্টির তোড় ও ঝোড়ো হাওয়ায় কেবল রক্ষা পাচ্ছে না, অনেকে প্লাবিত বা কাদা-ঢাকা রাস্তার কারণে স্কুল-কলেজে পৌঁছাতে পারছেন না; উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

মোংলা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ হারুন আর রশিদ জানান, মোংলা ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি আছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি না গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী উপকূলীয় এলাকায় আরও অন্তত দুই-তিন দিন বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসন, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে; জরুরি সেবা ও ত্রাণকার্যে দ্রুততার দাবি করা হচ্ছে। চাষি-খাদ্য সরবরাহ ও সাধারণ মানুষের জন্য তাত্ক্ষণিক সহায়তা না বাড়ালে সামনের দিনগুলোতে মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।