শুক্রবার, ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চিকেনস নেক নিরাপত্তা পর্যালোচনায় শিলিগুড়ি যাচ্ছেন অমিত শাহ

ভারতের উত্তর-পূběাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করে দেওয়া সংকীর্ণ কৌশলগত করিডর ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়েই বড় ধরনের ভাবনা নাটছে নয়াদিল্লিতে। এই পথেই অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম ও ত্রিপুরা–সহ বহু রাজ্যের রসদ, পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছায়। করিডরটি পূর্ব-পশ্চিমভাবে বন্ধ হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে—এজন্য এর নিরাপত্তা অত্যন্ত সংবেদনশীল।

নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও চীনের সীমান্তের কোলাহলে থাকা এই এলাকাটির নিরাপত্তা জোরদার করতে কেন্দ্রীয় সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শনিবার (১৮ জুলাই) শিলিগুড়ির ‘উত্তরকন্যা’ সচিবালয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠকে যোগ দেবেন। বৈঠকে সরেজমিনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

সূত্র বলছে, বৈঠকের মূল এজেন্ডায় থাকবে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্তবর্তী এলাকার উন্নয়ন ও অনুপ্রবেশ রোধ। সীমান্ত সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে বিএসএফের কাছে জমি হস্তান্তর করার যে প্রক্রিয়া রয়েছে, তার দ্রুততা ও কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা হবে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে প্রধানমন্ত্রী স্তরে এই বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, মুখ্য সচিব এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররা অংশ নেবেন। ইতোমধ্যে বিএসএফ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা কয়েক দফায় শিলিগুড়ি করিডর পরিদর্শন করেছেন, এবং তাদের রিপোর্টও সভায় উপস্থাপন করা হবে।

নয়াদিল্লি শিলিগুড়িকে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন’ (NSR) হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে, যাতে সুপরিকল্পিত পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে করিডরের নিরাপত্তা আরও কঠোর করা যায়। রাজনৈতিক অন্তরায় থাকার কারণে পূর্বে এই পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়নি—তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে কেন্দ্রের বৈরীত্ব সেই বাধা ছিল। তবে রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব জট খুলে গেছে এবং এখন নীতিনির্ধারকদের নজর সেখানে।

রাজ্য সরকারের দাবি অনুযায়ী সীমান্ত সুরক্ষার কাজে সহায়তার জন্য দ্রুত জমি হস্তান্তরও শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ জুলাই পর্যন্ত বিএসএফের হাতে মোট ১,০২৫.৭৫ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। এই জমির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭২.৬০৯২২ কিলোমিটার। সাব-জেলাভিত্তিক হস্তান্তরের তালিকায় দেখা যায়: মালদহে ১৭৬.৭৮ একর, কোচবিহারে ১৩৫.৩৩ একর, দক্ষিণ দিনাজপুরে ২৬.৪১ একর, উত্তর দিনাজপুরে ৬.৬১ একর, দার্জিলিংয়ে ৪.৩১ একর এবং জলপাইগুড়িতে ২.১৭ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে।

উত্তরকন্যার বৈঠকে এসব জমি হস্তান্তর, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের অগ্রগতি এবং সীমান্ত পেট্রোল বৃদ্ধি সংক্রান্ত কাজসমূহ পর্যালোচনা করা হবে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, উত্তরবঙ্গে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদহ—এই জেলাগুলো মিলিয়ে ভারতের বনাম-বাংলাদেশ প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। নদী ও জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রায় ১৯৫ কিলোমিটার সীমান্তে এখনও কোনও কাঁটাতারের বেড়া নেই।

তবে ওই অনিরক্ষিত নদীমুখী সীমানাগুলোতে বিএসএফের টহলের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে। জেলা ভিত্তিক সীমান্ত দৈর্ঘ্যে কোচবিহারই সর্বোচ্চ—প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার; এরপর দক্ষিণ দিনাজপুর ২৫০ কিমি এবং উত্তর দিনাজপুর ২২৭ কিমি। পাশাপাশি, নেপাল ও ভারতের মধ্যকার প্রায় ১,৭৫১ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায়ও নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা এই করিডরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়ন, সীমান্তি জনসংযোগ এবং সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। শিলিগুড়ি বৈঠক থেকে কোন সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে—তা নিয়েই এখন নজর থাকবে কেন্দ্র ও রাজ্যের বরাবর।