শুক্রবার, ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বন্ধ কারখানা চালু করতে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা ঋণ—গ্রাহক সুদ ৭%

বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ ও আংশিক সচল থাকা শিল্প ও সেবা খাতের কারখানা পুনরায় সম্পূর্ণ চালু করার উদ্দেশ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রাক-অর্থায়ন তহবিলের নীতিমালা ঘোষণা করেছে। এই তহবিলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে টাকা নিয়ে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে চলতি মূলধন ঋণ দেবে, যেখানে প্রতিটি কোম্পানি বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোর সাধারণ সুদ হার প্রায় ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই স্কিমে শিল্পোদ্যোক্তারা প্রায় অর্ধেক সুদে চলতি মূলধন সংগ্রহ করে উৎপাদন পুরো ক্ষমতায় চালু করতে পারবেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে ত্বরান্বিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বাড়ানো।

বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার রাতে ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত–সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ নীতিমালা জারি করেছে। এটি গত ২৩ মে গভর্নর ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের ধারাবাহিকতা হিসেবে আনা হয়েছে। দেশের সব ব্যাংক এই তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে এবং পরে গ্রাহকের কাছে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেবে।

কারী অধিকারী ও অগ্রাধিকার: নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও চলতি মূলধনের অভাবে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন বা সেবা দেওয়া বন্ধ বা আংশিকভাবে বন্ধ আছে, তাদের সহায়তা করা হবে। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান, প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান এবং কারখানা সচল করার উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ বা ভাড়া নিয়ে পুনরায় চালু করতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

যোগ্যতা: ঋণ নিতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির সিআইবি (ঋণ তথ্য ব্যুরো) অনুযায়ী খেলাপি ছাড়া থাকতে হবে এবং পূর্বে অর্থপাচার বা ঋণের অপব্যবহারের রেকর্ড থাকা যাবে না।

ঋণের শর্তাবলী: গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর ধরা হয়েছে, যা ব্যবহারের ভিত্তিতে নবায়নযোগ্য হবে। গ্রাহকদের জন্য ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ড থাকবে, অর্থাৎ প্রথম ছয় মাস সুদের কিস্তি আদায় শুরু হবে না। ব্যাংকগুলো গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রয়োজন মনে করলে প্রতিনিধি বা মনোনীত ব্যক্তি কোম্পানিতে বসাতে পারবে।

ব্যবহারের সীমা: এই তহবিল থেকে নেওয়া ঋণ মূলত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা (সর্বোচ্চ চার মাস), বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য উপযোগী পরিষেবা বিল পরিশোধ এবং উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা যাবে। কোনোভাবেই এই ঋণ পূর্ববর্তী কোনো ঋণের পরিশোধে বা দায় সমন্বয়ে ব্যবহার করা যাবে না। শ্রমিকদের বেতন অবশ্যই তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি প্রদান করতে হবে; নগদে প্রদান হারাম।

নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি: ঋণের সঠিক ব্যবহারের স্বার্থে ব্যাংকগুলো weekly বিক্রয় বা রাজস্ব রিপোর্ট সংগ্রহ করবে এবং ব্যাংকের প্রতিনিধি প্রতি তিন মাস অন্তর কারখানা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও যেকোনো সময়ে সরেজমিন পরিদর্শন করে ঋণের ব্যবহার যাচাই করতে পারবে। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে টাকা কাটার ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অতিরিক্ত ২ শতাংশ দণ্ড সুদ আরোপ করা হবে।

উৎপাদন-মুখী প্রয়াস এবং স্বীকৃতি: নীতিমালার সফল বাস্তবায়নে যারা বড় অবদান রাখবে—সেসব কোম্পানি ও ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হবে। সরকারি এই উদ্যোগ মূলত শিল্পে গতি ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।