সোমবার, ২০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শাপলা হত্যাকাণ্ড: খসড়া রিপোর্টে শেখ হাসিনা-সহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তথ্য; ফরমাল চার্জ ২১ জুলাই

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রস্তুত খসড়া প্রতিবেদন থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত সংস্থার দেয় সেই খসড়া প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর আগামী ২১ জুলাই ট্রাইবুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।

রোববার চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত সংস্থার খসড়া প্রতিবেদন হাতে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একটি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ পীর, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিস, জুবায়ের আহমেদসহ হেফাজতের ১০-১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন। তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর অ্যাডিশনাল আইজিপি শহীদুল্লাহ ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলমও বৈঠকে ছিলেন।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, খসড়া তালিকায় শেখ হাসিনাসহ পুলিশ ও বিজিবি প্রধানসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিবেদন এসেছে; তবে এটি খসড়া হওয়ায় পুরো তালিকা এখনই প্রকাশ করা হবে না। তিনি বললেন, ‘‘তালিকাটা আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখব। অনেক মনোনীত আসামি এখনো গ্রেফতার হননি; নাম প্রকাশ করলে গ্রেফতারে অসুবিধা হতে পারে।’’

চিফ প্রসিকিউটর শাপলা কাণ্ডকে ‘‘সুপারিশিয়র রেসপন্সিবিলিটি’’, ‘‘সিস্টেমেটিক’’ ও ‘‘টার্গেটেড কিলিং’’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটি এক সুপরিকল্পিত ঘটনা যেখানে স্থানীয় পারপেট্রেটরদের সাথে উচ্চপদস্থদেরও জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে। তিনি আরও জানান, ঘটনার সময় রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অর্গানকে নিয়োজিত করা হয়েছিল বলে তদন্তে পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত করে।

হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বলেন, নিহতদের মধ্যে ছাত্রসংখ্যা অনেকে ধরে নেওয়ার মতো নয়; শহীদদের মধ্যে বিভিন্ন পেশা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষ রয়েছেন—ইউনিভার্সিটি ও বুয়েটের ছাত্র, ট্রাক ড্রাইভার, শ্রমিক, বিভিন্ন বিরোধীদলের কর্মীসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষ। তিনি দাবি করেন, অনেক মানুষ এখনও নিখোঁজ আছেন এবং কিছু ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয়ভাবে গুমের চেষ্টা করা হয়েছে বলে তাদের আশঙ্কা।

নিহতদের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রথমে প্রায় ৬১ জনের তালিকা পাওয়া গিয়েছিল; এখন পর্যন্ত ৫৮ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। হেফাজত বলেছে খসড়া প্রতিবেদনে যা এসেছে তা তাদের প্রত্যাশার কাছাকাছি; তবে কিছু কারেকশন প্রয়োজন, যা দুই-তিন দিনের মধ্যে জানানো হবে।

পুলিশের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তীব্রভাবে অস্বীকার করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম। তিনি বলেন, তদন্তের সময় কাউকে বাদ বা ভেতরে আনার বিষয়ে তাদের উপর কোনো চাপ ছিল না এবং প্রসিকিউশন টিম সারা সময় তদন্তে জড়িত ছিলেন। চিফ প্রসিকিউটরও বলেন, আইন অনুযায়ী তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া আছে এবং তদন্ত অপরাধীর পরিচয়ের ভিত্তিতে হয়, ‘‘পুলিশ হলে পুলিশের পক্ষপাত’’—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।

ট্রাইব্যুনালে আগামী ২১ জুলাই বিচার কাজ শুরু হওয়ার দিনই চিফ প্রসিকিউটর অভিযোগপত্র দাখিলের আশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি আরও বলেন, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হবে না, কিন্তু কোনো দোষী যাতে ফেলে না যায় সেজন্য সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

এর আগে ৮ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন যে ১৩ বছর আগের ঘটনার তদন্ত শেষ হয়েছে এবং খসড়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই চলছে। মামলার আসামির তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের নাম উঠে এসেছে বলে খরচাপ্রাপ্ত সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা ও শাহরিয়ার কবীরের নামও প্রসিকিউটিভ সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু হলে খসড়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে রেকর্ড অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে, এবং ২১ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিলকে সেই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।