২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্তরে ঘটানো হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা শেখ হাসিনা সহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে। তদন্ত সংস্থা পাওয়া খসড়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২১ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। সূত্র জানিয়েছে, আসামির তালিকায় বিএনপির নয়—আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা-মন্ত্রী ও কিছু কর্ণধারসহ সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল আজিজও নাম থাকতে পারেন।
রোববার চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত সংস্থার খসড়া প্রতিবেদন সম্পর্কে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক নেতৃত্বে ১০-১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল অংশ নেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ পীর, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিস ও জুবায়ের আহমেদ। তদব্দ্যান্ত তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর অ্যাডিশনাল আইজিপি শহীদুল্লাহ ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলমও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এবং মাওলানা মামুনুল হক সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে পরিস্থিতি জানালেন। চিফ প্রসিকিউটর বললেন, খসড়া রিপোর্টে শেখ হাসিনাসহ পুলিশ প্রধান, বিজিবি প্রধানসহ কয়েকজন সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ রয়েছে; যদিও এটা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তিনি জানান, খসড়াটি প্রকাশের আগে যাচাই-বাছাই করা হবে, কারণ অনেক সম্ভাব্য আসামি এখনও গ্রেফতার হননি এবং নাম প্রকাশ করলে তাদের ধরতে সমস্যা হবে।
‘কেন সাধারণ আদালতের বদলে ট্রাইব্যুনাল?’—এই প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর ঘটনাটিকে সুপরিকল্পিত ও সিস্টেম্যাটিক হত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, এটি একটি বিস্তৃত ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড, যেখানে সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি রয়েছে এবং স্থানীয় কার্যকরি সংঘবদ্ধদেরও অংশ ছিল। পরিকল্পিতভাবে যখন হেফাজত প্রতিবাদ করছিল, তখন রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো পরিকল্পনার অংশে ওই জনগোষ্ঠীকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ঘটনার কেন্দ্রীয় দায়িত্ব যারা ছিল তাদের খোঁজেই তদন্ত করা হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পুলিশর। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘পুলিশ হলে পুলিশের পক্ষপাতিত্ব হবে’—এমন আশঙ্কা করার প্রয়োজন নেই; তদন্তে অপরাধীরা যাদের যা—তালিকাই বিচার করার ভিত্তি হবে।
নিহতসংখ্যা ও হেফাজতের অবস্থান নিয়েও কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর ও হেফাজতের নেতারা। চিফ প্রসিকিউটর জানান, তাদের কাছে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬১ জনের তালিকা এসেছিল; এখন পর্যন্ত ৫৮ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। অপরদিকে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, তাঁদের কাছে থাকা তথ্য ও তদন্তের মাধ্যমে নিহতদের সংখ্যা ও পরিচয় সংগ্রহ করা হয়েছে, তবে অনেকেই এখনও নিখোঁজ—এরা রাষ্ট্রীয়ভাবে গুম করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে শহীদদের মধ্যে ছাত্রদের অংশ কম, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ—ইউনিভার্সিটি ও বুয়েটের ছাত্র, ট্রাক চালক, শ্রমিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও এতে রয়েছেন।
খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে হেফাজতের পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। মাওলানা মামুনুল হক বলেন, প্রাথমিকভাবে রিপোর্টে কিছু সামান্য সংশোধনের বিষয় দেখেছেন তারা; দুই-এক দিনের মধ্যে সংশোধন সম্পর্কে মন্তব্য জানানো হবে। তিনি যোগ করেন, তাদের আশা ও অভিযোগের মোকাবেলায় এই খসড়া রিপোর্ট প্রায় কাছাকাছিই আছে।
প্রসিকিউশনের প্রতি কোনও চাপ ছিল কি না—তদন্তকারী কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম বলেন, তদন্তের সময় তাদের ওপর কোনো প্ররোচনা বা চাপ ছিল না; প্রসিকিউশন টিম শুরু থেকেই তাঁদের সঙ্গে ছিল এবং প্রতিটি বিষয়ে সম্মতি নেয়া হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরও বললেন, তদন্তে নিরপেক্ষতা রক্ষা করা হয়েছে এবং প্রয়োজন পড়লে পুলিশের বিরুদ্ধেই তদন্ত করেছে দল।
মামলাটির পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর জানালেন, ‘‘যদি কোনো আসামি নিরপরাধ প্রমাণিত হয় আমরা কাউকে দোষী করে যুক্ত করব না; কিন্তু কোনো দোষী যেন বাদ না পড়ে সে ধরনের সতর্কতা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, ট্রাইব্যুনাল শুরু হওয়ার দিন ২১ জুলাই ফরমাল চার্জ দাখিল করা যাবে।
আগে ৮ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন যে তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ এবং খসড়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই চলছে। এই মামলার আসামি তালিকায় থাকা নামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। প্রসিকিউশন সূত্রে আরও জানা গেছে—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা ও শাহরিয়ার কবীরও এই মামলায় নাম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।





